দুলাভাই…

121

 সুমন্ত আসলাম: চিৎকার করে ওঠেন দুলাভাই। হঠাৎ তার মতো এই বিশিষ্ট ভদ্রলোকের অভদ্রলোকীয় চিৎকারে আশপাশের প্রায় সবাই চমকে ওঠে। জুতার দোকানের একজন তো প্রায় লাফিয়ে উঠে জড়িয়ে ধরে তাকে। তারপর চেহারাটা বেয়ারাদের মতো মলিন করে চিনচিন করে বলে, ‘স্যার, প্যাটের মধ্যে কি মোচড় দিয়া উঠছে।’ দুলাভাই কিছু বলেন না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তার হাতে ধরা দৈনিক পত্রিকাটির দিকে। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে তার। লোকটা তাকে জড়িয়ে ধরে আছে এখনো। কিছুক্ষণ পর বুক-খালি-করা একটা নিৎশ্বাস ছেড়ে উদাস হয়ে তাকান জড়িয়ে-ধরা লোকটির দিকে। লোকটি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খায়, তারপর ছেড়ে দেয় দুলাভাইকে। ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। হাসিখুশি দুলাভাইয়ের এ অখুশিজনিত চেহারায় বেশ চমকে যাই আমি। মাত্র এক মিনিটের মধ্যে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। এবার আমি কাছ ঘেঁষে বসি। তারপর বেশ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘কী হয়েছে দুলাভাই?’ কথা বলেন না এবারও। মাঝখান থেকে জুতার দোকানের আরেকজন বলেন, ‘স্যার, যদি প্যাটে ব্যথা হয়, তবে ইসবগুলের ভুসি খাবেন।’ দুলাভাই কেমন যেন রেগে যান, ‘ভুসি’? ‘হ্যাঁ স্যার ভুসি, গরুর ভুসি না—ইসবগুলের ভুসি।’ পাশ থেকে আরেকজন বলে, ‘ভুসি খেলে কি পেটে ব্যথা কমব?’ ‘কমব মানে—একশবার কমব। কয়েকদিন আগে আমার বউ খালি কু কু করে। কিছু কয় না। তো আমি কইলাম, কী হইছে? ও কয় কু কু। আমি আবারও বলি, কী হইছে? ও আবারও কয়, কু কু। শেষে শুনলাম ওর প্যাটে ব্যথা। তারপর ওই ইসবগুলের ভুসি, সব শ্যাষ।’ দুলাভাই এবার একটু সোজা হয়ে বসেন। আমি তার হাত চেপে ধরি, ‘কী হয়েছে দুলাভাই?’ গম্ভীরমুখে তিনি তাকান এবার আমার দিকে। তারপর বেশ রাগ-রাগ গলায় বলেন, ‘আচ্ছা, তোর পরিচিত দুজন বিবাহিত লোকের নাম বল।’ ‘কেন, আপনি আর বাবা।’ কিছুটা বাহবা পাওয়ার আশায় ঝটপট উত্তর দিই। মুখটা বিকৃত করে দুলাভাই বলেন, ‘ধর, দেশের অর্ধেক লোক যদি একটা কাজ করে, তাহলে মানেটা কী দাঁড়ায়? দুজনের একজন সে কাজটা করে। তাই না?’ মাথাটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আমি বলি, ‘শিওর।’ ‘তাহলে এবার বল, তোর বাবা মানে আমার শ্বশুর আর আমি—এ দুজনের মধ্যে কোনজন বউ পিটাই?’ কিছু বুঝতে পারি না আমি। ঝট করে দুলাভাইয়ের হাত থেকে পত্রিকাটা নিই। তারপর হেসে বলি, ‘ও এই কথা!’ দুলাভাই শ্লেষ মাখানো গলায় বলেন, ‘বল, কে বউ পিটায়?’ ‘আমার ধারণা কেউ না।’ ‘তাহলে পেপারে এটা লিখল কেন—জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা তাদের স্বামীদের দ্বারা শারীরিকভাবে প্রহৃত হন।’ ‘ঘটনা হয়তো সত্য।’ ‘তার চেয়ে বেশি সত্য হচ্ছে—একটা স্ত্রীর কিছু হলে তা প্রকাশ পায়, কিন্তু স্বামীর কিছু হলে কি তা প্রকাশ পায়?’ ‘কেন পাবে না?’ ‘তুই কচু জানিস, গাধা! একবার বিয়ে করে দেখ, তবেই টের পাবি। সকালেই তোর বোনের সঙ্গে সামান্য জুতা নিয়ে কী ঝগড়া! তার নতুন জুতা জোড়ার একপাটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অবশেষে—।’ ‘অবশেষে?’ ‘না থাক।’ দুলাভাই এবার দোকানদারের দিকে তাকান। তারপর বেশ করুণ গলায় বলেন, ‘ভাই, একটা লেডিস স্যান্ডেল দেন।’ দোকানদার হেসে হেসে বলেন, ‘মাপটা কী?’ ঝটপট গায়ের জামাটা খুলে খুব নরম গলায় দুলাভাই বলেন, ‘ভাই, পিঠটা দেখে নিন, দাগটা এখনো স্পষ্ট ভেসে আছে।’

লেখকঃ সহ সম্পাদক, দৈনিক সমকাল

 

Facebook Comments